বুদ্ধিজীবীর দায়, বৌদ্ধিক একরৈখিকতার বিপদ এবং মানবিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন
এক
বুদ্ধিজীবী—ক্ষমতার মুখপাত্র, নাকি বিবেকের কণ্ঠস্বর?
সভ্যতার ইতিহাসে কিছু মানুষ রাষ্ট্র নির্মাণ করেন, কিছু মানুষ প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন, আর কিছু মানুষ নির্মাণ করেন চিন্তার ভূগোল; এঁরাই বুদ্ধিজীবী। তাঁদের হাতে অস্ত্র থাকে না, থাকে ভাষা; তাঁদের ক্ষমতা প্রশাসনিক নয়, নৈতিক; তাঁদের পরিচয় পদমর্যাদায় নয়, সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতায়। একটি সমাজের নৈতিক অবস্থা, তার আত্মসমালোচনার ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ কল্পনার শক্তি অনেকাংশেই নির্ভর করে এই মানুষদের ওপর।
কিন্তু বুদ্ধিজীবী কাকে বলা যায়? বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, গবেষক, লেখক বা শিল্পী হলেই কি তিনি বুদ্ধিজীবী? নাকি বুদ্ধিজীবিতা একটি নৈতিক অবস্থান, যেখানে জ্ঞান শুধু পেশা নয়, জনজীবনের প্রতি এক দায়?
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এমিলি জোলা'র বিখ্যাত খোলা চিঠি J'Accuse...! আধুনিক বুদ্ধিজীবীর ধারণাকে নতুন মাত্রা দেয়। রাষ্ট্র যখন অন্যায়কে আড়াল করছিল, তখন জোলা নিজের সামাজিক মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং জনপ্রিয়তার ঝুঁকি নিয়ে সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই মুহূর্তে 'বুদ্ধিজীবী' শব্দটি শুধু জ্ঞানচর্চার পরিচয় নয়, নৈতিক সাহসের প্রতীক হয়ে ওঠে।
পরবর্তীকালে জুলিয়েন বেন্ডেলা তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Treason of the Intellectuals-এ এক কঠিন সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন। তাঁর মতে, যখন বুদ্ধিজীবী সত্য ও ন্যায়ের পরিবর্তে দলীয় আবেগ, জাতিগত অহংকার কিংবা ক্ষমতার স্বার্থে নিজেকে সমর্পণ করেন, তখন তিনি তাঁর ঐতিহাসিক দায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন। বুদ্ধিজীবীর প্রথম আনুগত্য কোনো দল, সরকার, গোষ্ঠী বা বাজারের প্রতি নয়; তাঁর প্রথম আনুগত্য সত্য ও ন্যায়ের প্রতি।
এই ভাবনাকে আরও গভীর করেন এডওয়ার্ড সাঈদ। তাঁর কাছে বুদ্ধিজীবী সেই ব্যক্তি, যিনি প্রতিষ্ঠানের নিরাপদ আশ্রয়ে নয়, বিবেকের অস্বস্তিকর ভূখণ্ডে অবস্থান করেন। তিনি জনপ্রিয়তার বিনিময়ে নীরবতা কেনেন না; বরং প্রয়োজনে একাকী হয়েও প্রশ্ন তোলেন। কারণ সত্যের পথ করতালির নয়।
এই প্রশ্ন আজ আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে তথ্যের বিস্ফোরণ ঘটেছে, কিন্তু স্বাধীন চিন্তার বিস্তার সেই অনুপাতে ঘটেনি। জ্ঞানের বিস্তৃতি বেড়েছে, কিন্তু জিজ্ঞাসার সাহস কি বেড়েছে? মতামতের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু সমালোচনামূলক চিন্তার গভীরতা কি বৃদ্ধি পেয়েছে? এই প্রশ্নগুলো কেবল একাডেমিক নয়; একটি গণতান্ত্রিক সমাজের অস্তিত্বের প্রশ্ন।
এখানেই হচ্ছে মুক্তবুদ্ধির ধারণা। মুক্তবুদ্ধি মানে কোনো মতাদর্শহীনতা নয়; যা এমন এক বৌদ্ধিক সততা, যেখানে নিজের বিশ্বাসকেও প্রশ্ন করার সাহস থাকে। জন স্টুয়ার্ট মিল তাঁর On Liberty গ্রন্থে লিখেছিলেন, কোনো মতকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ না থাকলে সত্যও ধীরে ধীরে প্রাণহীন মতবাদে পরিণত হয়। ভিন্নমতকে দমন করা মানে একটি কণ্ঠকে নীরব করা নয়; সত্যের বিকাশের সম্ভাবনাকেও সংকুচিত করা।
এ কারণেই প্রকৃত বুদ্ধিজীবী কখনো নিজের মতকে চূড়ান্ত বলে ঘোষণা করেন না। তিনি জানেন, জ্ঞান হচ্ছে চলমান সংলাপ। প্রশ্নহীন নিশ্চিত্য মূলত জ্ঞানের নয়, মতাদর্শের বৈশিষ্ট্য।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আধুনিক সমাজে আরেকটি প্রবণতা ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে—বৌদ্ধিক একরৈখিকতা। এ এমন এক অবস্থা, যেখানে মতের বৈচিত্র্য ধীরে ধীরে সংকুচিত হয় এবং একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা, নির্দিষ্ট ভাষ্য কিংবা নির্দিষ্ট মতাদর্শ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। যা সবসময় কোনো দৃশ্যমান ষড়যন্ত্র নয়; অনেক সময় এটি তৈরি হয় একই ধরনের শিক্ষা, একই সামাজিক পরিমণ্ডল, একই তথ্যপ্রবাহ এবং পারস্পরিক অনুমোদিত সংস্কৃতির মাধ্যমে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন। বৌদ্ধিক একরৈখিকতা মানেই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়। এ হচ্ছে কাঠামোগত ঝুঁকি—যেখানে ভিন্নমত প্রকাশ ক্রমে কঠিন হয়ে ওঠে, আত্মসমালোচনা দুর্বল হয় এবং প্রশ্ন করার চেয়ে সম্মতি দেওয়া বেশি নিরাপদ বলে মনে হয়। ফলে জ্ঞানচর্চা ধীরে ধীরে অনুসন্ধানের পরিবর্তে পুনরাবৃত্তিতে পরিণত হয়।
এ বাস্তবতাকে বোঝার জন্য আমাদের আবেগের নয়, দর্শনের সহায়তা নিতে হবে। কারণ প্রকৃত বুদ্ধিজীবীর কাজ পক্ষ নির্বাচন নয়; বরং সত্য অনুসন্ধানের এমন একটি পরিবেশ রক্ষা করা, যেখানে বহু মত একসঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে।
আমাদের বাঙালি মননে এই ঐতিহ্য সুদীর্ঘকালের। রবীন্দ্রনাথ 'চিত্ত যেথা ভয়শূন্য'এর স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ছিল না; ছিল বৌদ্ধিক স্বাধীনতারও ঘোষণা। আর কাজী আবদুল ওয়াদুদ যুক্তি, আত্মসমালোচনা এবং মুক্তবিচারকে একটি সুস্থ সমাজের অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁদের উত্তরাধিকার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—দেশকে ভালোবাসা মানে প্রশ্ন করার অধিকারকে ভালোবাসা; কারণ প্রশ্নহীন আনুগত্য নাগরিক গুণ নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতার সূচনা।
আজ আমাদের বড় প্রয়োজন এমন বুদ্ধিজীবী, যিনি রাষ্ট্রের সমালোচনা করতে যেমন সাহসী, তেমনি নিজের প্রিয় মতাদর্শের সীমাবদ্ধতাও স্বীকার করতে সক্ষম। যিনি জনপ্রিয়তার নয়, সত্যের পক্ষে দাঁড়াবেন; গোষ্ঠীর নয়, মানুষের পক্ষে কথা বলবেন এবং যিনি মনে করবেন—বিবেকের স্বাধীনতা ছাড়া জ্ঞানের স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ।
এ কারণেই মূল প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে ঘিরে নয়। মূল প্রশ্ন হলো—আমরা কি এমন একটি বৌদ্ধিক সংস্কৃতি নির্মাণ করছি, যেখানে ভিন্নমতকে সম্মান করা হয়, নাকি এমন এক পরিবেশ তৈরি করছি, যেখানে নীরব সম্মতিই নিরাপদ? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আমাদের গণতন্ত্রের গভীরতা, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণশক্তি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ নাগরিকতার মান।
চলবে ...