এক
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতে অধ্যাপক প্রদীপ কুমার বিশ্বাস ছিলেন এক নিভৃত অথচ দীপ্তিমান আলোকশিখা। ১৯৪২ সালের ১৭ অক্টোবর, গভীর মধ্যরাতের নিস্তব্ধ প্রহরে, টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে জন্ম নিয়েছিলেন এই জ্ঞানতাপস। যেন রাত্রির নিবিড় অন্ধকার ভেদ করেই এক আলোকময় মননের যাত্রা শুরু হয়েছিল। তাঁর মনন গঠনের পেছনে গভীর প্রেরণা হয়ে ছিলেন তাঁর সংস্কৃতিমনা আলোকিত মা আভা রানী বিশ্বাস, শিক্ষয়িত্রী স্ত্রী ঝর্ণা বিশ্বাস, কন্যা ঊর্মিমালা বিশ্বাস ও গীতমালা বিশ্বাস ছেলে প্রণয় কুমার বিশ্বাস—তাঁদের আন্তরিক সমর্থন তাঁর আজীবনের সাহিত্যসাধনা, জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতিসেবায় অবিচল থাকতে শক্তি ও প্রেরণা জুগিয়েছেন।
কবি, অধ্যাপক, গবেষক, প্রাবন্ধিক, সংস্কৃতিজন ও অসামান্য স্মৃতিশক্তির অধিকারী এই মনীষী সনেটচর্চা, সাহিত্য-গবেষণা এবং সংস্কৃতির নিবিড় সম্পৃক্তির মধ্য দিয়ে ময়মনসিংহ তথা বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে এক স্বতন্ত্র মর্যাদা অর্জন করেন।
২০১৬ সালের ২৬ জুন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর জীবনাবসান ঘটলেও তাঁর সৃষ্টিশীল উত্তরাধিকার, প্রজ্ঞার দীপ্তি এবং ভদ্রচিত কোমল ব্যক্তিত্ব আজও বাংলা সাহিত্যের অনুরাগী, গবেষক ও সংস্কৃতিসেবীদের কাছে এক অবিনশ্বর আলোকবর্তিকা হয়ে আছে।
কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন আলো নিয়ে; কিছু মানুষ নিজেরাই আলো হয়ে ওঠেন। প্রথম শ্রেণির মানুষ অন্ধকার দূর করেন, দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ মানুষের ভেতরে আলো জ্বালিয়ে দেন। প্রদীপ কুমার বিশ্বাস ছিলেন সেই বিরল দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষদের একজন। তিনি প্রদীপ নামটি শুধু বহন করেননি—জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে তাঁর অর্থকে সত্য করে তুলেছিলেন। তাঁর আলো কোনো উৎসবের আতশবাজির মতো মুহূর্তের দীপ্তি ছিল না; ছিল প্রদীপের শিখার মতো দীর্ঘ, সংযত, ধীর এবং অনিঃশেষ। যে আলো চোখ ঝলসে দেয় না, বরং মানুষের ভেতরের অন্ধকারকে নীরবে আলোকিত করে।
ব্রহ্মপুত্রের তীর জানে—কিছু মানুষ নদীর মতোই বেঁচে থাকেন; প্রবাহে নয়, গভীরতায়। তাঁদের জীবনের শব্দ কম, অথচ প্রতিধ্বনি দীর্ঘ। তাঁদের পদচারণা মৃদু, অথচ ইতিহাসে তাঁদের উপস্থিতি সুদূরপ্রসারী। তাঁরা প্রতিষ্ঠার উচ্চ মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজেদের ঘোষণা করেন না; মানুষের স্মৃতি, মনন ও মূল্যবোধের ভেতর নীরবে স্থান করে নেন। প্রদীপ কুমার বিশ্বাস ছিলেন তেমনই এক নিভৃতচারী আলোকসাধক, যাঁর জীবন ছিল জ্ঞান, বিনয়, সৌজন্য, ভদ্রতা এবং সংস্কৃতিচর্চার এক বিরল সমন্বয়।
আজ তাঁর প্রয়াণের এক দশক অতিক্রান্ত। দশ বছর—সময়ের হিসাবে দীর্ঘ; কিন্তু কিছু মানুষের অনুপস্থিতি সময় দিয়েও পূরণ হয় না। তাঁদের চলে যাওয়া মানে কেবল একজন মানুষের মৃত্যু নয়; একটি জীবন্ত গ্রন্থাগারের নীরব হয়ে যাওয়া, একটি চলমান বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া, একটি শহরের সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক অনিবার্য শূন্যতা।
তবে কি সত্যিই তিনি চলে গেছেন?
যখন কোনো তরুণ পাঠক প্রথমবারের মতো একটি মূল্যবান বই খুলে প্রশ্ন করতে শেখে, যখন কোনো শিক্ষক পাঠ্যসূচির সীমা ছাড়িয়ে ছাত্রকে চিন্তার স্বাধীনতার দিকে আহ্বান করেন, যখন কোনো লেখক তথ্যের ভিড়ে সত্যের দীপ্তি খুঁজে বেড়ান, যখন কোনো সংস্কৃতিকর্মী ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে সমাজকে ভাবেন—সেই প্রতিটি মুহূর্তে প্রদীপ কুমার বিশ্বাসের জীবনদর্শন যেন নীরবে ফিরে আসে। মানুষ সহজাত নিয়মে চলে যায়; কিন্তু যে মানুষ চিন্তার ভেতর বাস করেন, তাঁরা মৃত্যুকেও অতিক্রম করেন।
আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো জ্ঞানের অভাব নয়; প্রজ্ঞার অভাব। তথ্যের বিস্ফোরণের এই যুগে মানুষ যত দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করছে, তত দ্রুত হারিয়ে ফেলছে গভীর মনোযোগ, অধ্যবসায় ও আত্মজিজ্ঞাসা। এ কারণেই প্রদীপ কুমার বিশ্বাসের জীবন আজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তিনি জ্ঞানকে কখনও তথ্যের স্তূপ মনে করেননি; মনে করতেন আত্মার অনুশীলন। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল না পেশা, ছিল সাধনা; লেখা ছিল না আত্মপ্রচার, ছিল সামাজিক দায়; ভাষা ছিল না যোগাযোগের যন্ত্র, ছিল সভ্যতার দীর্ঘ স্মৃতি।
তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি ভাষা শেখা মানে শুধু নতুন শব্দ শেখা নয়; নতুন সভ্যতার জানালা খুলে দেওয়া। সে কারণেই সংস্কৃতের প্রাচীন মন্ত্রধ্বনি থেকে বাংলা ভাষার প্রাণস্পন্দন, পাশ্চাত্যের দর্শন থেকে বিশ্বসাহিত্যের বিস্তৃত ভুবন—সবখানেই ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ। ভাষার ভেতর দিয়ে তিনি মানুষের ইতিহাস পড়তেন, দর্শনের ভেতর দিয়ে মানুষের আত্মাকে বুঝতে চাইতেন, সাহিত্যের ভেতর দিয়ে খুঁজতেন মানবতার দীর্ঘ যাত্রাপথ।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, দর্শন এবং ভাষাবিজ্ঞান—এই তিনটি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয় কোনো ডিগ্রির সীমায় আবদ্ধ ছিল না। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে তিনি ছিলেন এক নিরলস স্বশিক্ষিত মনীষী। ইতিহাস, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, লোকসংস্কৃতি, বিশ্বসাহিত্য, নন্দনতত্ত্ব, সমাজভাবনা, ভাষাতত্ত্ব—অসংখ্য বিষয়ে তাঁর অধ্যয়ন ছিল বিস্ময়কর। তাঁর সঙ্গে একবার দীর্ঘ আলাপের সুযোগ যাঁদের হয়েছে, তাঁরা জানেন—তিনি শুধু বই পড়তেন না; বইকে নিজের জীবনবোধের সঙ্গে মিলিয়ে নিতেন।
তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল প্রায় কিংবদন্তির মতো। কোনো প্রসঙ্গ উঠলে অবলীলায় উদ্ধৃত করতেন প্রাচীন শাস্ত্র, বিশ্বদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক রচনা কিংবা পাশ্চাত্যের দার্শনিকদের বক্তব্য। সক্রেটিস থেকে প্লেটো, শঙ্করাচার্য থেকে চৈতন্য, রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ, কাজী নজরুল থেকে জসীমউদ্দীন, কাহলিল জিবরান থেকে টলস্টয়—তাঁদের ভাবনা যেন তাঁর স্মৃতিতে পৃথক পৃথক তথ্য হিসেবে নয়, একটি অবিচ্ছিন্ন মানবিক সংলাপ হিসেবে বাস করত।
তাঁকে অনেকেই বলতেন—চলমান গ্রন্থাগার। কিন্তু এই অভিধাটিও তাঁর জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ গ্রন্থাগার বই সংরক্ষণ করে; তিনি জ্ঞানকে জীবন্ত করে তুলতেন। কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হলে তা কেবল তথ্যের বিনিময়ে সীমাবদ্ধ থাকত না; ধীরে ধীরে তা রূপ নিত ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য, সমাজ ও মানবজীবনের এক বহুমাত্রিক অভিযাত্রায়। তাঁর কথায় কখনও আত্মপ্রদর্শনের অহংকার ছিল না; ছিল আজীবন শেখার আনন্দ।
অথচ এই বিরাট পাণ্ডিত্য তাঁকে কখনও উচ্চাভিলাষী করে তোলেনি। বর্তমান সময়ে জ্ঞানকে অনেকেই প্রতিষ্ঠার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেন; তিনি জ্ঞানকে ব্যবহার করেছেন আত্মশুদ্ধির পথ হিসেবে। খ্যাতির বাজারে তিনি নিজের নাম বিক্রি করেননি, করতালির জন্য সাজাননি কোনো মঞ্চ। ফলভারে নত বৃক্ষ যেমন আরও বিনম্র হয়, তেমনি জ্ঞানের উচ্চতায় উঠেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন আরও সহজ, আরও নিরহংকার।
তাঁর পদচারণা ছিল এতটাই মৃদু যে মনে হতো মাটিও যেন টের পায় না—একজন মানুষ হেঁটে গেলেন। কিন্তু তাঁর চিন্তার পদধ্বনি আজও প্রতিধ্বনিত হয় অসংখ্য ছাত্র, সহকর্মী, সাহিত্যপ্রেমী এবং সংস্কৃতিকর্মীর জীবনে। কোনো কোনো মানুষ তাঁদের উচ্চারণের জন্য স্মরণীয় হন; প্রদীপ কুমার বিশ্বাস স্মরণীয় তাঁর নীরবতার জন্যও। কারণ তাঁর নীরবতা ছিল গভীর পাঠের, দীর্ঘ চিন্তার এবং আত্মমগ্ন সাধনার নীরবতা।
তাঁর জীবনের দিকে তাকালে মনে হয়, সত্যিকারের জ্ঞানসাধকরা কখনও আলো খোঁজেন না; তাঁরা নিজেরাই আলো হয়ে ওঠেন। সেই আলো চোখে পড়ে না সবসময়, কিন্তু মানুষের অন্তর্লোকে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রদীপ কুমার বিশ্বাস ছিলেন তেমনই এক আলোকসাধক—যাঁর জীবনের দীপ্তি তাঁর রচনায়, তাঁর ছাত্রদের স্মৃতিতে, তাঁর সহযাত্রীদের শ্রদ্ধায় এবং একটি জনপদের সাংস্কৃতিক চেতনায় আজও জ্বলে আছে নীরব প্রদীপের মতো।
দুই
শিক্ষকতা অনেকেই করেন; কিন্তু সকল শিক্ষক আলোকপ্রদীপ হয়ে ওঠেন না। কেউ পাঠ্যসূচি শেষ করেন, কেউ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পরামর্শ দেন, আবার কেউ কেউ মানুষের ভেতরে এমন এক অনুসন্ধিৎসা জাগিয়ে দেন, যা সারা জীবন ধরে জ্বলতে থাকে। প্রদীপ কুমার বিশ্বাস ছিলেন সেই বিরল তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষক—যাঁর শ্রেণিকক্ষের পরিসর ছিল চার দেওয়ালের অনেক বাইরে।
সিটি স্কুল, বিদ্যাময়ী স্কুল এবং পরবর্তীকালে মধুপুর ডিগ্রি কলেজে তাঁর শিক্ষকতার দীর্ঘ পথচলা ছিল কোনো চাকরিজীবনের বিবরণ নয়; ছিল এক জ্ঞানব্রতের ইতিহাস। তিনি অবসর নিয়েছিলেন চাকরি থেকে, কিন্তু শিক্ষা থেকে নয়। কারণ তাঁর কাছে শিক্ষকতা ছিল না পেশা; ছিল মানুষের ভেতরে সুপ্ত আলোকবীজ জাগিয়ে তোলার এক নিরবচ্ছিন্ন সাধনা।
তিনি কখনও কেবল উত্তর শেখাতেন না; শিখিয়ে দিতেন প্রশ্ন করতে। তাঁর বিশ্বাস ছিল—যে সমাজ প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, সে সমাজ চিন্তা করাও ভুলে যায়। তাই তাঁর ক্লাসে মুখস্থ বিদ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ভাবনার স্বাধীনতা। পাঠ্যবই ছিল সূচনা, সমাপ্তি নয়। একটি কবিতা থেকে তিনি পৌঁছে যেতেন দর্শনে, একটি ইতিহাসের ঘটনা থেকে সমাজতত্ত্বে, একটি শব্দ থেকে ভাষাতত্ত্বে, একটি উপমা থেকে বিশ্বসাহিত্যের বিস্ময়কর ভুবনে।
এই কারণেই তাঁর ছাত্ররা কেবল তথ্য নিয়ে ফিরত না; ফিরে যেত নতুন করে পৃথিবীকে দেখার এক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।
তাঁর বক্তৃতা ছিল এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি বলতে পারতেন, অথচ একটুও ক্লান্তি ছিল না। কারণ তাঁর ভাষণ ছিল না অলঙ্কারময় বাগ্মিতার প্রদর্শনী; ছিল মননের এক প্রবহমান নদী। এক প্রসঙ্গ থেকে আরেক প্রসঙ্গে তিনি এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে অগ্রসর হতেন যে, মনে হতো জ্ঞানের বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলো যেন তাঁর কণ্ঠে এসে একটি মহাদেশে পরিণত হচ্ছে।
সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল, শঙ্করাচার্য, বুদ্ধ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, মাইকেল, বঙ্কিম, লালন, জিবরান, টলস্টয়, দস্তয়েভস্কি—বিশ্বের নানা প্রান্তের চিন্তাশীল মানুষ তাঁর আলোচনায় এমন স্বাভাবিকভাবে এসে দাঁড়াতেন, যেন তাঁরা সবাই একই দীর্ঘ সংলাপের অংশ। তাঁর স্মৃতি ছিল বিস্ময়কর, কিন্তু তার চেয়েও বিস্ময়কর ছিল সেই স্মৃতিকে অর্থপূর্ণভাবে ব্যবহার করার ক্ষমতা।
অনেক সময় জরুরি কোনো প্রবন্ধ, বক্তৃতা কিংবা গবেষণামূলক রচনা প্রস্তুত করতে তিনি মুখে বলে যেতেন, আর পাশে বসা কেউ লিখে নিতেন। দীর্ঘ সময় ধরে অবিরাম বলে যাওয়ার মধ্যেও তথ্যের নির্ভুলতা, উদ্ধৃতির যথার্থতা এবং যুক্তির ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ থাকত। যেন তাঁর ভেতরে একটি সুবিন্যস্ত গ্রন্থাগার সর্বদা জেগে আছে।
এই অসাধারণ স্মৃতিশক্তি তাঁকে অহংকারী করেনি। বরং তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নতুন কোনো তথ্য জানতে পারলে শিশুর মতো আনন্দিত হতেন। তিনি জানতেন—জ্ঞান কখনও পূর্ণ হয় না; মানুষ যত শেখে, ততই উপলব্ধি করে কত কিছু শেখার বাকি।
এই বিনয়ই তাঁকে বড় এবং মহান করেছে।
ময়মনসিংহের সাংবাদিক সমাজের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও ছিল গভীর ও আন্তরিক। স্থানীয় সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় কক্ষগুলো জানত—কোনো জটিল বিষয়ে একটি সুসংহত, তথ্যসমৃদ্ধ এবং মননশীল উপসম্পাদকীয় প্রয়োজন হলে প্রদীপ কুমার বিশ্বাসের কাছে যাওয়া যায়। ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ভাষা, দর্শন, সমাজ, শিক্ষা কিংবা সমকালীন জাতীয় প্রশ্ন—প্রায় সব বিষয়েই তিনি লিখতে পারতেন সমান স্বাচ্ছন্দ্যে।
আজকের মতো তখন ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার ছিল না। ইন্টারনেট ছিল না হাতের মুঠোয়। তথ্য অনুসন্ধান মানে ছিল দীর্ঘ অধ্যয়ন, গ্রন্থাগারে বসে গবেষণা, বহু বই ঘেঁটে সত্য যাচাই করা। সেই সময় স্থানীয় বহু দৈনিক, সাপ্তাহিক ও বিশেষ প্রকাশনার জন্য তিনি নিয়মিত লিখেছেন। সম্পাদকরা তাঁর লেখার অপেক্ষায় থাকতেন। পাঠকেরাও জানতেন—প্রদীপ কুমার বিশ্বাসের লেখা মানে বিষয়টি নতুন আলোয় দেখা।
কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, এই বিপুল লেখালেখির বিনিময়ে তিনি প্রায় কোনো সম্মানীই পাননি।
এ নিয়ে তাঁর কোনো অভিযোগ ছিল না। কোনো ক্ষোভও নয়। জ্ঞানকে তিনি কখনও বাজারের পণ্য ভাবেননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল—যে জ্ঞান মানুষের কাজে আসে, সেটিই প্রকৃত জ্ঞান। সম্পাদকীয় কক্ষে বসে কখনও কখনও উল্টো তিনি নিজেই সহকর্মীদের আপ্যায়ন করতেন। যেন লেখা নয়, সম্পর্কই ছিল তাঁর কাছে বড়; পারিশ্রমিক নয়, মানুষের উপকারই ছিল তাঁর প্রকৃত প্রাপ্তি।
এই নির্লোভ মনোভাব আজকের সময়ে প্রায় বিস্মৃত এক মূল্যবোধের কথা মনে করিয়ে দেয়। যখন জ্ঞানও ক্রমশ বাজারের পণ্যে পরিণত হচ্ছে, তখন প্রদীপ কুমার বিশ্বাসের জীবন আমাদের শেখায়—প্রকৃত বিদ্যা আত্মমর্যাদা বাড়ায়, কিন্তু আত্মপ্রচার শেখায় না; মানুষের সম্মান অর্জন করে, কিন্তু সম্মান দাবি করে না।
সভা, সেমিনার, সাহিত্য-আসর, পাঠচক্র—যেখানেই তাঁকে আহ্বান করা হতো, সম্ভব হলে তিনি সাড়া দিতেন। কারণ তিনি মনে করতেন, জ্ঞান ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; সামাজিক সম্পদ। যে জ্ঞান ভাগ করা যায় না, সে জ্ঞান অসম্পূর্ণ।
এই বিশ্বাস থেকেই তিনি ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে হয়ে উঠেছিলেন এক অপরিহার্য উপস্থিতি। কোনো আলোচক না পাওয়া গেলে মানুষ বলত—'প্রদীপ স্যার আছেন।' কারণ সবাই জানত, তিনি যে বিষয়ে কথা বলবেন, তা কেবল তথ্যের পুনরাবৃত্তি হবে না; হয়ে উঠবে নতুন করে ভাবার একটি সুযোগ।
এভাবেই ধীরে ধীরে তিনি একজন ব্যক্তি থেকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিলেন। কোনো সরকারি পদ, কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মান কিংবা প্রচারের আলো তাঁকে বড় করেনি। তাঁকে বড় করেছে তাঁর অবিরাম অধ্যয়ন, তাঁর মননের সততা, তাঁর বিনয় এবং মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম দায়বোধ।
তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল আলোকিত মানুষ গড়ার শিল্প। আর সেই শিল্পের নিভৃত কারিগর হিসেবেই তিনি আজও বেঁচে আছেন—তাঁর ছাত্রদের চিন্তায়, তাঁর সহকর্মীদের স্মৃতিতে, তাঁর পাঠকদের মননে এবং ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে।
তিন
একটি শহরেরও স্মৃতি থাকে। নদীর মতো, বৃক্ষের মতো, পুরোনো ভবনের মতো শহরও কিছু মানুষের ভেতরে নিজেকে সংরক্ষণ করে। সময়ের সঙ্গে রাস্তা বদলায়, স্থাপত্য বদলায়, প্রজন্ম বদলায়; কিন্তু কিছু মানুষ থেকে যান শহরের জীবন্ত স্মৃতিসৌধ হয়ে। তাঁদের কাছে একটি জনপদের ইতিহাস শুধু তথ্য নয়, একটি চলমান জীবনকাহিনি।
ময়মনসিংহের জন্য অধ্যাপক প্রদীপ কুমার বিশ্বাস ছিলেন তেমনই এক জীবন্ত স্মৃতিভাণ্ডার।
ইতিহাস, লোকঐতিহ্য, ভাষা, সাহিত্য, নগর-সংস্কৃতি, পুরোনো প্রতিষ্ঠান, বরেণ্য মানুষ, হারিয়ে যাওয়া জনপদের কাহিনি—কোনো বিষয়েই তাঁর জ্ঞানের পরিসর সীমাবদ্ধ ছিল না। সাংবাদিক, গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষক, প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তি—যাঁদেরই কোনো ঐতিহাসিক বা সাংস্কৃতিক তথ্যের প্রয়োজন হতো, তাঁরা প্রায় স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তাঁর দ্বারস্থ হতেন। কারণ তাঁরা জানতেন, প্রদীপ কুমার বিশ্বাস কেবল তথ্য জানেন না; তিনি তথ্যের উৎস, প্রেক্ষাপট, বিবর্তন এবং তাৎপর্যও জানেন।
আজকের ভাষায় তাঁকে ‘ডাটাবেস’ বলা যেতে পারে; কিন্তু সে তুলনা তাঁর ক্ষেত্রে খুবই অপ্রতুল। তিনি ছিলেন এক জীবন্ত জ্ঞানপরম্পরা। বইয়ের ভেতরের জ্ঞান এবং জীবনের অভিজ্ঞতাকে তিনি এমনভাবে মিলিয়ে নিয়েছিলেন যে তাঁর প্রতিটি আলোচনা হয়ে উঠত ইতিহাস, দর্শন ও মানবিক বোধের এক অনন্য সমন্বয়।
এই মননশীল কেন্দ্রগুলোর একটি ছিল ঐতিহ্যবাহী ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদ।
একটি সাহিত্যসংগঠন কেবল অনুষ্ঠান আয়োজন করে না; একটি জনপদের সাংস্কৃতিক চেতনাকে দীর্ঘকাল ধরে বহন করে। ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদ সেই দায়িত্ব বহু দশক ধরে পালন করে এসেছে। আর এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অধ্যাপক প্রদীপ কুমার বিশ্বাসের সম্পর্ক ছিল আনুষ্ঠানিক নয়—ছিল আত্মীয়তার।
তিনি সংগঠনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন; কিন্তু দায়িত্বের চেয়েও বড় ছিল তাঁর নিবেদন। সাহিত্য সংসদের প্রতিটি আয়োজন, প্রতিটি পাঠচক্র, প্রতিটি আলোচনা যেন তাঁর কাছে ব্যক্তিগত দায়িত্বের অংশ হয়ে উঠেছিল।
বিশেষ করে ‘বীক্ষণ’—সাহিত্য সংসদের পাঠচক্র—তাঁর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।
শুক্রবার মানেই ‘বীক্ষণ’বার। অনেকের কাছে তা ছিল একটি সাহিত্যসভা; কিন্তু প্রদীপ কুমার বিশ্বাসের কাছে ছিল মননের উৎসব। নতুন বই, নতুন ভাবনা, পুরোনো দর্শন, সমকালীন সমাজ, বিশ্বসাহিত্য, ইতিহাস কিংবা নন্দনতত্ত্ব—যে বিষয়ই আলোচনায় আসুক না কেন, তিনি প্রস্তুত থাকতেন।
অনেক সময় নির্ধারিত বক্তা উপস্থিত হতে পারতেন না। উপস্থিতদের মধ্যে উৎকণ্ঠা দেখা দিত। তখন প্রায় নিশ্চিত কণ্ঠে কেউ একজন বলতেন—'প্রদীপ স্যার তো আছেন।' এ যেন ছিল এক সাংস্কৃতিক নিশ্চয়তা।
বক্তব্যে তিনি উঠে দাঁড়াতেন। কোনো লিখিত বক্তব্য নয়, কোনো কাগজ নয়, কোনো প্রস্তুতির বাহুল্য নয়—শুধু তাঁর দীর্ঘ অধ্যয়ন, অসাধারণ স্মৃতি এবং মননের স্বচ্ছতা। তারপর শুরু হতো এক অনবদ্য বৌদ্ধিক ভ্রমণ।
শ্রোতারা বুঝতেই পারতেন না সময় কীভাবে কেটে যাচ্ছে।
তাঁর বক্তৃতা ছিল না বক্তৃতা; ছিল সংলাপ। তিনি জ্ঞান চাপিয়ে দিতেন না, জ্ঞানের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করতেন। তাঁর আলোচনায় মতবাদের কঠোরতা ছিল না; ছিল মুক্ত অনুসন্ধানের আহ্বান।
এই কারণেই ‘বীক্ষণ’ কেবল একটি পাঠচক্র হয়ে থাকেনি; প্রদীপ কুমার বিশ্বাসের মতো ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে তা হয়ে উঠেছিল মুক্তবুদ্ধির এক উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
কবি হিসেবেও তাঁর স্বাতন্ত্র্য ছিল স্পষ্ট।
তিনি জনপ্রিয়তার সহজ পথ বেছে নেননি। কবিতাকে তিনি আবেগের তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন শিল্পশৃঙ্খলার কঠোর অনুশীলন হিসেবে। সে কারণেই সনেট ছিল তাঁর প্রিয় কাব্যরূপ।
চৌদ্দ পঙ্ক্তির সংযমী নির্মাণের মধ্যে তিনি ধারণ করতে চেয়েছেন দেশপ্রেম, প্রকৃতি, মানুষ, প্রেম, ইতিহাস, ব্যক্তিত্ব, আধ্যাত্মিকতা এবং জীবনদর্শনের বিস্তৃত অনুষঙ্গ। তাঁর কবিতায় অলঙ্কারের চাকচিক্যের চেয়ে চিন্তার স্থায়িত্ব বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
‘সমর্পিত সনেট সম্ভার’ তাঁর কাব্যসাধনার এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য।
কিন্তু তাঁর সাহিত্যকর্ম শুধু কবিতায় সীমাবদ্ধ ছিল না।
প্রবন্ধ, নিবন্ধ, কলাম, স্মৃতিচারণ, গবেষণাধর্মী রচনা—বহু ধারাতেই তিনি লিখেছেন। স্থানীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক, বিশেষ সংকলন এবং বিভিন্ন প্রকাশনায় তাঁর লেখার বিস্তৃতি ছিল ঈর্ষণীয়। ময়মনসিংহের সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, বরেণ্য ব্যক্তিত্ব এবং সমাজভাবনা নিয়ে তাঁর বহু লেখা আজও মূল্যবান দলিল হয়ে থাকতে পারে।
দুঃখের বিষয়, সেই বিপুল রচনার বড় অংশ আজ বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন পত্রিকার পুরোনো সংখ্যায়, ব্যক্তিগত সংগ্রহে কিংবা অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিতে।
একজন গবেষকের জন্য এটি শুধু আক্ষেপের নয়, উদ্বেগেরও বিষয়।
কারণ একটি সমাজ যখন তার জ্ঞানসাধকদের লেখা সংরক্ষণ করে না, তখন সে সমাজ নিজের ইতিহাসকেই হারাতে শুরু করে।
প্রদীপ কুমার বিশ্বাসের আরেকটি বিরল বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর ধর্মবোধ। তিনি ছিলেন গভীরভাবে আধ্যাত্মিক; কিন্তু কখনও সাম্প্রদায়িক নন। ধর্ম তাঁর কাছে ছিল না পরিচয়ের পতাকা, ছিল আত্মশুদ্ধির অনুশীলন। মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা, বিনয়, সহমর্মিতা এবং নৈতিক জীবন—এসবকেই তিনি ধর্মীয় চেতনার প্রকৃত প্রকাশ বলে মনে করতেন।
তাঁর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সহজ ও সরল।
বিত্ত, প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক প্রচারের প্রতি তাঁর কোনো আকর্ষণ ছিল না। বই, লেখা, ছাত্র, আলোচনা, পরিবার এবং সংস্কৃতিচর্চা—এই ছিল তাঁর জগত।
এই নিভৃত সাধনার পথ সহজ ছিল না।
যে মানুষ সংসারের প্রয়োজনের চেয়ে বইয়ের প্রয়োজনকে বড় করে দেখেন, যিনি সময়ের বড় অংশ ব্যয় করেন অধ্যয়ন ও লেখালেখিতে, তাঁর পাশে যদি সহমর্মী পরিবার না থাকে, তবে সেই সাধনা পূর্ণতা পায় না।
এই জায়গায় তাঁর পরিবার বিশেষভাবে স্মরণীয়।
স্ত্রী বর্ণা বিশ্বাস, সন্তান উর্মিমালা বিশ্বাস, প্রণয় কুমার বিশ্বাস এবং গীতামালা বিশ্বাস—তাঁদের সহযোগিতা ও নীরব সমর্থন তাঁর মননশীল জীবনকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছিল। পারিবারিক দায়িত্ব পালন করতে করতেই তিনি জ্ঞানের দীর্ঘ সাধনা চালিয়ে যেতে পেরেছেন।
আজ তাঁর শারীরিক অনুপস্থিতির বহু বছর পরে দাঁড়িয়ে যখন আমরা তাঁর জীবনকে ফিরে দেখি, তখন উপলব্ধি করি—তিনি কেবল একজন শিক্ষক, কবি বা প্রাবন্ধিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি সাংস্কৃতিক বিবেক।
যে বিবেক মানুষকে শিখিয়েছে—জ্ঞান মানে কেবল জানার ক্ষমতা নয়; জ্ঞান মানে বিনয়, দায়িত্ব এবং সমাজের প্রতি নৈতিক অঙ্গীকার।
এ কারণেই প্রদীপ কুমার বিশ্বাসকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন মানুষকে স্মরণ করা নয়; একটি মূল্যবোধকে পুনরুদ্ধার করা।
চার
একজন জ্ঞানসাধকের প্রকৃত মৃত্যু কবে ঘটে?
হৃদস্পন্দন থেমে যাওয়ার দিন? শেষ নিঃশ্বাসের মুহূর্তে? নাকি তখন, যখন তাঁর চিন্তা, তাঁর লেখা, তাঁর স্বপ্ন এবং তাঁর নির্মিত মননের উত্তরাধিকার সমাজ বিস্মৃত হয়?
সময়ের ইতিহাস বলছে—শারীরিক মৃত্যু কোনো মনীষীর শেষ পরিণতি নয়। সক্রেটিস বেঁচে আছেন তাঁর প্রশ্নে, বুদ্ধ তাঁর করুণায়, রবীন্দ্রনাথ তাঁর সৃষ্টিতে, লালন তাঁর মানবধর্মে। মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাঁর জাগানো বোধ যদি মানুষের মধ্যে চলমান থাকে, তবে মৃত্যু কেবল একটি জৈবিক ঘটনা মাত্র।
অধ্যাপক প্রদীপ কুমার বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও আমাদের সামনে সেই প্রশ্নই এসে দাঁড়ায়।
২০২৬ সালের ২৬ জুন তাঁর প্রয়াণের এক দশক পূর্ণ হয়েছে। দশ বছর—একটি প্রজন্মের বেড়ে ওঠার সময়। এই দশ বছরে কত নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে, কত নতুন লেখক এসেছেন, কত প্রতিষ্ঠান বদলেছে। কিন্তু আমরা কি যথার্থভাবে সংরক্ষণ করতে পেরেছি সেই মানুষটিকে, যিনি একটি জনপদের মননজগত নির্মাণে জীবনব্যাপী শ্রম দিয়ে গেছেন?
এই প্রশ্ন আমাদের কেবল আবেগের নয়; সাংস্কৃতিক দায়িত্ববোধেরও।
প্রদীপ কুমার বিশ্বাসের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি, বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে থাকা প্রবন্ধ, সম্পাদকীয়, সনেট, গবেষণামূলক রচনা, স্মৃতিচারণ এবং বক্তৃতাগুলো আজও যদি সংগ্রহ করা না হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছ থেকে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানভাণ্ডার আড়াল করে রাখব। তাঁর রচনাগুলো কেবল সাহিত্য নয়; ময়মনসিংহের ইতিহাস, সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য, ভাষা ও সমাজচিন্তার মূল্যবান দলিলও বটে।
এ কারণেই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ—সংরক্ষণ।
প্রথমত, তাঁর সমস্ত প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত রচনা সংগ্রহ করে ‘প্রদীপ কুমার বিশ্বাস রচনাসমগ্র’ প্রকাশ করা সময়ের দাবি। বহু লেখা আজ স্থানীয় পত্রিকার পুরোনো সংখ্যায়, ব্যক্তিগত সংগ্রহে কিংবা পরিবারের কাছে ছড়িয়ে আছে। এগুলো উদ্ধার করা এখনই প্রয়োজন। কারণ সময় যত গড়াবে, ততই হারিয়ে যাবে মূল্যবান দলিল।
দ্বিতীয়ত, তাঁর জীবন, কর্ম, সাহিত্য, দর্শন, শিক্ষকতা এবং সাংস্কৃতিক অবদান নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করা প্রয়োজন। শুধু স্মৃতিচারণ নয়; গবেষণাধর্মী নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, অপ্রকাশিত আলোকচিত্র, চিঠিপত্র, ছাত্র ও সহকর্মীদের স্মৃতিকথা—সব মিলিয়ে এমন একটি গ্রন্থ, যা ভবিষ্যতের গবেষকদের জন্য নির্ভরযোগ্য উৎস হয়ে থাকবে।
তৃতীয়ত, তাঁর নামে একটি ডিজিটাল আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। বর্তমান যুগে জ্ঞান সংরক্ষণের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম ডিজিটাল সংরক্ষণ। তাঁর লেখা, বক্তৃতা, অডিও, ভিডিও, পাণ্ডুলিপি, সংবাদপত্রে প্রকাশিত নিবন্ধ, আলোকচিত্র—সবকিছুকে ডিজিটাল রূপে সংরক্ষণ করা গেলে দেশ-বিদেশের গবেষকরাও উপকৃত হবেন।
চতুর্থত, ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদ অথবা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক উদ্যোগে কিংবা পারিবার পর্যায়ের বিশেষ তৎপরতায় ‘প্রদীপ কুমার বিশ্বাস স্মৃতি সংসদ’ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এটি কেবল স্মরণসভা আয়োজনের প্রতিষ্ঠান হবে না; নিয়মিত পাঠচক্র, গবেষণা, বক্তৃতা, প্রকাশনা এবং তরুণদের মননচর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
পঞ্চমত, প্রতি বছর তাঁর জন্মদিন কিংবা প্রয়াণদিবসে ‘প্রদীপ কুমার বিশ্বাস স্মারক বক্তৃতা’ আয়োজন করা যেতে পারে। দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, গবেষক ও চিন্তাবিদদের আমন্ত্রণ জানিয়ে এই বক্তৃতামালা একটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক পরিসরে পরিণত হতে পারে।
ষষ্ঠত, সাহিত্য, গবেষণা ও মননচর্চায় উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে ‘প্রদীপ কুমার বিশ্বাস স্মৃতি বৃত্তি’ বা ‘স্মৃতি পুরস্কার’ চালু করা যেতে পারে। বিশেষ করে তরুণ গবেষক, কবি, প্রাবন্ধিক এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য এই উদ্যোগ তাঁর জীবনদর্শনেরই ধারাবাহিকতা বহন করবে।
সপ্তমত, ময়মনসিংহের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে গবেষণার জন্য তাঁর নামে একটি গবেষণা পুরস্কার প্রবর্তন করা যেতে পারে। কারণ এই জনপদের ইতিহাসকে তিনি যেমন ভালোবেসেছেন, তেমনি পরবর্তী প্রজন্মও যেন সেই ভালোবাসা উত্তরাধিকারসূত্রে পায়।
এসব উদ্যোগ কেবল একজন মানুষকে স্মরণ করার জন্য নয়; একটি জনপদের বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার রক্ষার জন্যও অপরিহার্য।
আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়—যাঁরা প্রচারের আলোয় থাকেন, তাঁদের স্মরণে বড় আয়োজন হয়; আর যাঁরা নিভৃতে জীবন কাটিয়ে সমাজকে সমৃদ্ধ করেন, তাঁরা ধীরে ধীরে বিস্মৃতির আড়ালে চলে যান।
প্রদীপ কুমার বিশ্বাস সেই বিস্মৃতির মানুষ হওয়ার যোগ্য নন।
তিনি যে আলোকরেখা রেখে গেছেন, তা কেবল কয়েকজন শিক্ষার্থী বা সাহিত্যপ্রেমীর ব্যক্তিগত স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকার নয়; তা একটি জনপদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকার দাবি রাখে।
আজ সময় এসেছে রাষ্ট্রেরও তাঁর দিকে ফিরে তাকানোর।
বাংলা ভাষা, সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং মননচর্চায় তাঁর জীবনব্যাপী অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া উচিত। রাষ্ট্রীয় সম্মাননা কেবল একজন মানুষকে সম্মানিত করে না; সেই সম্মানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রও ঘোষণা করে—জ্ঞান, বিনয় এবং সাংস্কৃতিক সাধনা আমাদের জাতীয় মূল্যবোধের অংশ।
এই স্বীকৃতি প্রদীপ কুমার বিশ্বাসের ব্যক্তিগত প্রয়োজন নয়; প্রয়োজন আমাদের সাংস্কৃতিক বিবেকের।
শেষ পর্যন্ত এই যে, প্রদীপ কুমার বিশ্বাসকে কোনো বিশেষ অভিধায় বাঁধা যায় না। তিনি শিক্ষক, আবার তারও বেশি; তিনি কবি, আবার তারও বেশি; তিনি প্রাবন্ধিক, গবেষক, সংস্কৃতিজন—কিন্তু এই সব পরিচয়ের সমষ্টিও যেন তাঁকে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করতে পারে না।
তিনি ছিলেন এক আলোকসাধক।
যাঁর কাছে জ্ঞান ছিল প্রার্থনা, বিনয় ছিল অলংকার, ভাষা ছিল মানবসভ্যতার দীর্ঘ স্মৃতি, সাহিত্য ছিল আত্মশুদ্ধির পথ এবং মানুষ ছিল সমস্ত চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু।
আজও যখন সন্ধ্যা নামে ব্রহ্মপুত্রের তীরে, যখন ময়মনসিংহের আকাশে নক্ষত্রেরা একে একে জ্বলে ওঠে, তখন মনে হয়—কিছু আলো কখনও নিভে যায় না। তারা প্রদীপের শিখার মতো মানুষের অন্তর্লোকে জ্বলতে থাকে।
অধ্যাপক প্রদীপ কুমার বিশ্বাস তেমনই এক অনির্বাণ আলোর নাম।
তিনি আজ দৃষ্টিসীমার ওপারে; কিন্তু বাংলা ভাষার অন্তর্লোকে তাঁর রেখে যাওয়া আলোকরেখা এখনও পথ দেখায়। কোনো তরুণ যখন সত্যিকারের বইয়ের প্রেমে পড়ে, কোনো শিক্ষক যখন পাঠদানকে চাকরি নয়, ব্রত বলে মনে করেন, কোনো লেখক যখন জনপ্রিয়তার চেয়ে সততাকে বড় মনে করেন, কোনো সংস্কৃতিকর্মী যখন ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে সমাজকে স্থান দেন—সেই প্রতিটি মুহূর্তে তিনি নীরবে ফিরে আসেন।
নিভৃত সাধকেরা কখনও হারিয়ে যান না।
তাঁরা থেকে যান শব্দের গভীরে, চিন্তার অন্তর্লোকে, প্রজন্মের মননে, একটি জনপদের সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে এবং কৃতজ্ঞ মানুষের হৃদয়ে।
অধ্যাপক প্রদীপ কুমার বিশ্বাস কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি মৃত্যুহীন আলোকিত এক উত্তরাধিকার।